সোমবার, ১৩ Jul ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : ‘আমার স্বামীর করোনা নেই। তিনি প্রেসার ও ডায়াবেটিসের রোগী। স্যার, আমার স্বামী খুবই অসুস্থ। ওনারে একটু দেখেন।’ ঢাকার চারটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরেও গৃহবধূ ফরিদা আক্তার সুমি এমন আকুতি জানিয়েও কারও সহানুভূতি পাননি ও স্বামীর চিকিৎসাও করাতে পারেনি।
শেষ পর্যন্ত বিনা চিকিৎসায় তার স্বামী দুলাল শিকদার (৩৮) মারা গেছেন। বিনা চিকিৎসায় দুলালের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে খিলক্ষেত থানা পুলিশ জানিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে স্বামীর লাশ নিয়ে বিলাপ করছিলেন সুমি। তিনি বলেন, অসুস্থ স্বামী দুলালকে নিয়ে তিনি দিনভর এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন।
একটি হুইল চেয়ার অথবা স্ট্রেচারের জন্য ওয়ার্ডবয়, নার্স, নিরাপত্তাকর্মী যখন যাকে পেয়েছেন তাকেই তিনি অনুরোধ করেছেন। টাকাও দিতে চেয়েছেন। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি।
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার অভাবে তার স্বামী মারা গেল। অহন দুই সন্তান নিয়ে আমি কই যাব?’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুমি যুগান্তরকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই তার স্বামী দুলাল ব্লাড প্রেসার ও ডায়াবেটিস রোগে ভুগছিলেন। প্রায় বছর খানেক আগে বারডেম হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন ওই হাসপাতালে চিকিৎসার পর দুলাল প্রায় মাস খানেক সুস্থ ছিলেন। এরমধ্যেই বুধবার রাতে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।
সুমি বলেন, তাদের বাসা খিলক্ষেতের ভূঁইয়াপাড়ায়। ভোররাতে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে পাশের একটি ক্লিনিকে দুলালকে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসা না দিয়ে সরকারি কোনো হাসপাতালে নেয়ার জন্য বলা হয়। এরপর সকাল ৯টার দিকে সিএনজিতে করে দুলালকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
সুমির অভিযোগ হাসপাতালের কেউ তার স্বামীর আশপাশে পর্যন্ত আসেননি। ওয়ার্ড বয়, নার্স যখন যাকে সামনে পেয়েছেন তিনি তখন তার হাত-পায়ে ধরেছেন। কিন্তু করোনা রোগী ভেবে কেউ দুলালের আশপাশে আসেননি। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর দুপুর ১২টার দিকে তিনি দুলালকে বারডেম হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেও কেউ তার স্বামীকে দেখেনি।
অভিযোগ করে সুমি বলেন, তাদের হাত-পায়ে ধরেছি, বলেছি দুলাল করোনা রোগী না। বারডেম হাসপাতালের কার্ড দেখিয়ে বলেছি, দুলাল ডায়েবেটিসের রোগী। এরপরও চিকিৎসা না দিয়ে ওই হাসপাতাল থেকে বলা হয়, রোগীকে অক্সিজেন দিতে হবে আমাদের অক্সিজেন নেই। এ সময় রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার জন্য বলা হয়।
সুমি আরও বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানেও কোনো চিকিৎসা হয়নি। অভিযোগ করে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর ২০০ টাকা দিয়ে একটি হুইল চেয়ার নিয়ে তিনি নিজেই স্বামীকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। অনেক অনুরোধ করলে ডাক্তাররা ৭০১ নম্বর রুমে ভর্তি করেন।
যুগান্তরকে সুমি বলেন, তিনি হাসপাতালের কিছুই চেনেন না। এ জন্য ওয়ার্ডবয় থেকে শুরু করে সবাইকে ৭০১ নম্বর রুম চিনিয়ে দেয়ার জন্য বলেন। এভাবে প্রায় চার ঘণ্টা কেটে যায়। স্বামীকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে রেখে তিনি নিজেই ৭০১ নম্বর রুম বের করেন। এরপর তাকে নিতে এসে দেখেন তার স্বামী হুইল চেয়ারে কাত হয়ে আছেন। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। এভাবে স্বামীকে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে কাঁদতে থাকায় হাসপাতালের লোকজন এসে বলেন দুলাল মারা গেছেন।
এদিকে এ খবর পেয়ে খিলক্ষেত থানার এসআই সুমন শিকদারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল হাসপাতালে আসে। সুমির সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে
এসআই সুমন শিকদার বলেন, এটি স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে চিকিৎসকরা ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ পেলে পুলিশ তদন্ত করে দেখবে। দুলাল শিকদারের গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। তিনি ঢাকায় গাড়ি কেনা-বেচার ব্যবসা করতেন।
নগরকন্ঠ.কম/এআর